সাইফুল আলম সরকার, ঢাকা:
খামারিদের ডিমের লাভজনক বিক্রয়মূল্য নিশ্চিতকরণ, পোলট্রি খামারিদের ডিজিটাল ডেটাবেজ চালু এবং প্রান্তিক খামারিদের সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সেখানে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশাররফ হোসেন চৌধুরী বলেন, খামার পর্যায়ে প্রতিটি ডিমের উৎপাদন খরচ ১০ টাকা হলেও এখন বিক্রয়মূল্য ৬ টাকা।
ফলে প্রতিটি ডিমে ৪ টাকা লোকসান হচ্ছে। এভাবে প্রতি মাসে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ক্ষতির শিকার হচ্ছেন দেশের তৃণমূল পর্যায়ের পোল্ট্রি খামারিরা।
এভাবে চলতে থাকলে আগামী দুই বছরের মধ্যে তৃণমূল পর্যায়ের পোল্ট্রি খামারিরা টিকে থাকবে না, সব ঝরে পড়বে।
এ অবস্থায় ভবিষ্যতে পুরো পোল্ট্রি খাত চলে যাবে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অধীনে। এর ফলে সহজলভ্য প্রোটিনের বড় উৎস ডিম কিনে খেতে হবে বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ দামে। কর্মসংস্থান হারাবে লাখ লাখ মানুষ।
গতকাল শনিবার (১১ জুলাই) জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর আহমেদ চৌধুরী হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান বিপিআইএর সভাপতি মোশাররফ হোসেন চৌধুরী।
তিনি বলেন, দেশের হাজার হাজার ডিম উৎপাদনকারী খামারি দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
ফিড, বাচ্চা, ওষুধ, ভ্যাকসিন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহনসহ প্রতিটি উৎপাদন উপকরণের মূল্য বাড়লেও খামার পর্যায়ে ডিমের দামের কোনো সামঞ্জস্য নেই।
ফলে খামারিরা প্রতিনিয়ত লোকসানের বোঝা বহন করে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন এবং অনেকে খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন। সংবাদ সম্মেলনে দেশের পোলট্রি খাতের একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়।
বিপিআইএ জানায়, ২০২০ সালের আগে বাংলাদেশে পোলট্রি খামারির সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ।
কিন্তু গত পাঁচ বছরে ধারাবাহিক লোকসান, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বাজারমূল্যের অস্থিতিশীলতা ও সহজ শর্তে অর্থায়নের অভাবে এই সংখ্যা কমে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ বছরে প্রায় ৬৪ হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারি এই খাত থেকে ঝরে পড়েছেন।
দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে দেশের ডিম উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ভোক্তাদেরও বেশি মূল্য দিয়ে ডিম কিনতে হবে।
ফরিদপুরের প্রান্তিক খামারি আমিনুল প্রধান বলেন, ‘ডিমের সর্বনিম্ন দাম ১০ থেকে ১১ টাকা করতে হবে।
মেডিসিনের দাম কমাতে হবে। তেজগাঁও সমিতি যেন ডিমের দাম ঠিক করে না দেয়। ডিমের দাম নির্ধারণ করবে সরকার।
পোলট্রি খাতের উন্নয়নে বিপিআইএর প্রধান দাবিসমূহ:
লাভজনক বিক্রয়মূল্য নিশ্চিতকরণ: কৃষকের ধান বা আখের মতো পোলট্রি খাতেও একটি যৌক্তিক মূল্য সুরক্ষাব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে উৎপাদন খরচ বিবেচনা করে খামারিরা ন্যায্য মুনাফা পান। জাতীয় ডিজিটাল ডেটাবেজ ও ফার্মার আইডি:
প্রকৃত খামারিদের শনাক্ত করতে, উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতি রিয়েল টাইম পর্যবেক্ষণ করতে এবং সরকারি প্রণোদনা সরাসরি খামারিদের কাছে পৌঁছাতে একটি ডিজিটাল ডেটাবেজ এবং প্রতিটি নিবন্ধিত খামারির জন্য ‘খামারি পরিচয়পত্র চালু করতে হবে।
উপজেলা পর্যায়ে কোল্ড স্টোরেজ: বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের সময় খামারিদের পুঁজির সুরক্ষায় এবং কম দামে ডিম বিক্রি ঠেকাতে উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক ডিম সংরক্ষণ ব্যবস্থা বা কোল্ড স্টোরেজ গড়ে তুলতে হবে।
পোলট্রি বিমা ও ডেভেলপমেন্ট বোর্ড গঠন: প্রান্তিক খামারিদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় অবিলম্বে পোলট্রি বিমা চালু এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী ‘বাংলাদেশ জাতীয় পোলট্রি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড’ গঠন করতে হবে।
বিপিআইএর সভাপতি আরও বলেন, ‘আমরা কোনো ভর্তুকিনির্ভর শিল্প চাই না; আমরা চাই একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ ও টেকসই বাজার ব্যবস্থা।
যেখানে উৎপাদক ন্যায্যমূল্য পাবেন, ভোক্তা সহনীয় দামে নিরাপদ খাদ্য পাবেন এবং দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এই সংকট নিরসনে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।