আ জা ডেক্স
১৯৬০ সাল। দেশের বৃহত্তর মসজিদ বায়তুল মোকাররমের নির্মান কাজ উদ্বোধন করছেন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান।
পশ্চিম পাকিস্তানের ধনকুবের ব্যাবসায়ী আব্দুল লতিফ বাওয়ানীর ব্যাক্তিগত অর্থায়নে মসজিদটি নির্মিত হয়।
১৯৬৩ সালে আংশিক নির্মাণের পরে নামাজ পড়া শুরু হয় এবং ১৯৬৮ সালে পুরো মসজিদের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়।
ধারনক্ষমতার দিক থেকে এটি ছিলো তৎকালীন পৃথিবীর ৬ষ্ঠ বৃহত্তম মসজিদ।
তবে এই তালিকার প্রথম ৫ টি মসজিদই মধ্যযুগে নির্মিত বিধায় বায়তুল মোকাররম ছিল আধুনিক যুগে নির্মিত পৃথিবীর বৃহত্তম মসজিদ, যেখানে একসাথে ৪০ হাজার মানুষ নামাজ আদায় করতো।
কেবল আকারেই নয়, নকশা এবং স্থাপত্য শৈলীতেও এটি ছিলো উপমহাদেশের "স্টেট অফ আর্ট"।
মসজিদটির নকশা করেছেন পশ্চিম পাকিস্তানের সিন্ধুর বিখ্যাত স্থপতি আব্দুল হোসেইন এম. থারিয়ানি।
তিনি ঐতিহ্যবাহী মুঘল স্থাপত্যের সাথে আধুনিক আন্তর্জাতিক শৈলীর মিশ্রণ ঘটিয়ে এই অবিস্মরণীয় নকশাটি তৈরি করেন।
পবিত্র কাবার আদলে মূল অবয়ব:
বায়তুল মোকাররমের স্থাপত্য শৈলী বিশ্বজুড়ে অনন্য, কারণ এটি চিরাচরিত গম্বুজ ও মিনারের মুসলিম স্থাপত্যের বাইরে গিয়ে মক্কার পবিত্র কাবা শরীফের আদলে চারকোনা বা ঘনক আকৃতির করে ডিজাইন করা।
সাদা রঙের এই মূল ভবনটি আট তলা বিশিষ্ট এবং মাটি থেকে প্রায় ৯৯ ফুট উঁচু, যা আল্লাহর ৯৯টি পবিত্র নামকে নির্দেশ করে।
উত্তর ও দক্ষিণ দিকে রয়েছে দুটি চমৎকার প্রবেশ তোরণ, যার ছাদে অগভীর ও হালকা আকৃতির কৃত্রিম গম্বুজ রয়েছে।
তোরণগুলোর প্রবেশপথ তিনটি খরগোশের পায়ের খুরের মতো বাঁকানো খিলান দিয়ে সাজানো।
মসজিদের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো এবং বাতাস চলাচলের জন্য মূল প্রার্থনা হলের ছাদ বরাবর দুটি ছাদহীন উন্মুক্ত অভ্যন্তরীণ আঙিনা বা প্যাটিও রাখা হয়েছে।
এই আধুনিক নকশার কারণে বিশাল এই প্রার্থনা হলের ভেতরে সব সময় মনোরম ও স্নিগ্ধ পরিবেশ বজায় থাকে।
মসজিদের পূর্ব দিকে রয়েছে ২৯,০০০ বর্গফুটের বিশাল একটি খোলা চত্বর বা সাহান, যেখানে ঈদের মতো বড় জামাতে হাজার হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারেন।
এই সাহানের উত্তর ও দক্ষিণ দুই পাশেই বড় আকারে অজুখানা রাখা হয়েছে।
মুঘল ধারার বাগান:
মসজিদের কমপ্লেক্সের ভেতরে ফোয়ারা ও নান্দনিক সারিবদ্ধ গাছপালাসহ একটি চমৎকার বাগান রয়েছে।
এই বাগানের নকশাটি মূলত ঐতিহ্যবাহী মুঘল বাগান বা চারবাগ পদ্ধতি থেকে অনুপ্রাণিত।
বহুতল ও বহুমুখী কমপ্লেক্স :
বায়তুল মোকাররম কেবল একটি মসজিদ নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ বহুমুখী ইসলামিক কেন্দ্র।
নিচতলায় বিশাল মার্কেট বা বিপণিবিতান, অফিস, পাঠাগার এবং গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
মসজিদ নির্মানে ব্যায় মেটাতে লতিফ বাওয়ানি ১৯৬৪ সালে বায়তুল মোকাররম মার্কেট চালু করেন।
আজ আমরা বায়তুল মোকাররমের পাশে যে মার্কেটগুলো দেখি এগুলো তারই তৈরি।
বায়তুল মোকাররম মার্কেটের অনেক ব্যাবসায়ী ছিলেন অবাঙ্গালী, ১৯৭১ এর ডিসেম্বর নাগাদ যাদের বেশিরভাগকে হত্যা করা হয়।
১৯৭২ সালে মুজিব সরকার বায়তুল মোকাররম কমপ্লেক্স জব্দ করে নেয় এবং অবাঙালি/পাকিস্তানিদের বানানো বায়তুল মোকাররমকে বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ ঘোষণা করেন।
উল্লেখ্য, বায়তুল মোকাররম ছাড়াও আব্দুল লতিফ বাওয়ানী এই অঞ্চলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান তৈরি করেন৷
১৯৫৩ সালে তার প্রতিষ্ঠিত 'বাওয়ানী জুটমিলস' ছিল পুর্ববাংলার প্রথম পাটকল।