এস এম মিজান ও,নূরুল আজিজ চৌধুরী
ঢাকা রাজধানীর ডেমরা, রূপগঞ্জের বাস্তহারা নামের পরিচিত (চনপাড়া) অপরাধীদের নিরাপদ আস্তানা। মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, অস্ত্রবাজি এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখানে নিত্য দিনের ঘটনা।
সোমবার (০৩ আগষ্ট) মাএ কয়েক দিন আগে ও মাদক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় জহিরুল ইসলাম বাবুর উপর হামলা করে মাদক বিক্রেতার একদল, বর্তমানে সে ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন।
তার অবস্হা সংকটাপূর্ণ। বাবু বলছেন মাদক বিক্রেতা আলআমিন, ডিব্বা ইব্রাহিমের নেতৃত্বে ১০/১২ জনের গ্রুপটি তার উপর হামলা করে বর্তমান তার অবস্হা আশন্কাজনক।
যে কোনো ধরনের মাদক পাওয়া যায় এখানকার অলিগলিতে। অস্ত্রের বেচাকেনা, আর দাগী আসামিদের নিশ্চিন্তে পালিয়ে থাকার ‘সেফ হোম’।
রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চনপাড়া বস্তি বা চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র এমনই এক দুর্ভেদ্য অপরাধ সাম্রাজ্যের নাম।
প্রতি মাসে কোটি টাকার উপরে মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা হয় এই চনপাড়া বস্তিতে।
আধিপত্য বিস্তার নিয়ে গত ২০ বছরে চনপাড়া বস্তিতে খুন হয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তাসহ প্রায় ১৪ জন। গত দেড় যুগে শুধু চনপাড়া এলাকার মাদক ব্যবসা সংক্রান্ত ঘটনায় রূপগঞ্জ থানায় দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা শত শত।
জানাযায় চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রে মাদকের স্পট রয়েছে শতাধিক। এখানে মাদকের ব্যবসা হয় কয়েকটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে।
ফেনসিডিল, ইয়াবা, হেরোইন, মদ, গাজা বিক্রির জন্য রয়েছে পৃথক পৃথক সিন্ডিকেট।
কেউ কারো সেক্টরে ব্যবসা করবে না কিংবা কারো এলাকায় কেউ প্রবেশ করবে না, এটাই এখানকার অলিখিত নিয়ম।
আর নিয়ম ভাঙলেই আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ, খুন কিংবা এক গ্রুপের সোর্স অন্য গ্রুপের মাদকের চালান সম্পর্কে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্য দিয়ে ধরিয়ে দেয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এখানকার বেশ কয়েকটি সূত্র দৈনিক আমাদের জাগরন কে জানিয়েছেন, মূলত সিন্ডিকেটের কেউ না কেউ বড় কোনো রাজনৈতিক শেল্টারেই এখানকার রাজত্ব করে।
সূত্র জানান, রাজনৈতিক সভা, মিছিলে লোক সাপ্লাই করা, মাধ্যম থেকে নিম্ন সারির রাজনৈতিক নেতাদের ভাগবাটোয়ারা পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করে সিন্ডিকেট।
ভৌগলিক কারণে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর শত চেষ্টার পরেও চনপাড়ার কর্তৃত্ব নেয়া সম্ভব হয়ে উঠে না।
কারণ, চনপাড়া বস্তিতে প্রবেশের একটি মাত্র পথ থাকলেও এর ৩দিকে রয়েছে নদীপথ। ফলে সহজেই মাদক আনা নেওয়া এবং পুলিশের চোখ ফাঁকি দেয়া সম্ভব।
জানা গেছে, মূলত চনপাড়ায় মাদক বিক্রি হয় কয়েকটি স্তরে। প্রতিটি সিন্ডিকেটের একটি বা দুটি করে ওয়াচ পার্টি থাকে।
এদের কাজ পোশাকে বা সাদা পোশাকের পুলিশ-র্যাব দেখলে সতর্ক করে দেয়া।
এক গ্রুপ শুধু মাত্র খুচরা বিক্রি করে থাকে, যারা এক স্থানে বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না।
আর বড় ধরনের পাইকারি চালান নিয়ন্ত্রণ করে খোদ সিন্ডিকেটের প্রধানরা। সূত্রের দেয়া তথ্য মতে, কোনো কোনো সিন্ডিকেটের বহু নারী সদস্য রয়েছে।
কখনো মাদক ব্যবসায় ব্যবহার করা হচ্ছে বেদে বহর, কখনো লবণবাহী সাম্পান আবার সিমেন্টের ক্লিংকারবাহী কার্গো জাহাজ।
চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র এলাকার মাদক নির্মূল কমিটির রয়েছে বলে জানা গেছে।
চনপাড়া বস্তির সাধারণ বাসিন্দারা সন্ত্রাসীদের ভয়ে মুখ খুলতে নারাজ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য মতে ভৌগলিক কারণে চনপাড়া বস্তিতে ব্লক রেইড দেয়া খুবই দু:সাধ্য।
পুলিশ অভিযানে গেলেও বস্তির অসংখ্য সংকীর্ণ গলির কারণে বেগ পেতে হয়, বস্তির ৩ দিকে নদীপথ থাকায় তারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
কিন্তু আইন শৃঙ্খলা বাহিনী চনপাড়াকে পুরোপুরি মাদক বা অপরাধমুক্ত করতে পারবে না একথা মানতে নারাজ পুলিশ।
তবে চনপাড়ার সাধারণ বাসিন্দারা আক্ষেপ করে জানান, সেনাবাহিনীর অভিযান ছাড়া চনপাড়ার মাদক ব্যবসা কিংবা অপরাধ সাম্রাজ্য ধ্বংস করা মনে হয় অসম্ভব বিষয়।
কারণ গত ৩ দশকে পুনর্বাসন কেন্দ্রটি পরিণত হয়েছে অপরাধের রাজ্য হিসেবে।
এখানে মাদক ব্যবসা, অস্ত্র ব্যবসা, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ, দেহ ব্যবসার মতো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত বিশাল সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ মানুষ অসহায়।
এলাকাবাসী বলেন শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে এই অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব হবে না।
যদি স্থানীয় সব রাজনৈতিক নেতা জনপ্রতিনিধিরা এক না হন।