আ জা আন্তর্জাতিক ডেক্স
ইউরোপে ইসলাম, অভিবাসন ও জাতীয় পরিচয় নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক বহুদিনের।
তবে সেই ইউরোপেই ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে মুসলিম ফুটবলারদের প্রকাশ্য ধর্মীয় পরিচয় ও অনুশীলন নতুন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অনেকের মতে, এটি দেখিয়ে দিচ্ছে যে ইসলাম এখন ইউরোপীয় সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ২০০ কোটি মুসলিম বাস করেন, যা বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
১৩টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে তাই ইসলামের বিভিন্ন ধর্মীয় অনুশীলনের উপস্থিতি স্বাভাবিক ভাবেই চোখে পড়ে।
তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর জাতীয় দলে খেলা মুসলিম ফুটবলারদের প্রকাশ্য ধর্মীয় পরিচয়।
স্পেন জাতীয় দল ও বার্সেলোনার তরুণ ফরোয়ার্ড লামিন ইয়ামাল সৌদি আরবের বিপক্ষে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোল করার পর সেজদা দিয়ে উদযাপন করেন।
তার এই উদযাপন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এর কয়েক মাস আগে বার্সেলোনায় স্পেন ও মিসরের মধ্যকার প্রীতি ম্যাচে গ্যালারির একাংশ থেকে ‘যে লাফায় না, সে মুসলিম’ স্লোগান দেওয়া হয়েছিল।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইয়ামাল লিখেছিলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি একজন মুসলিম। ফুটবল মানুষের বিনোদন ও অনুপ্রেরণার জন্য, কারও ধর্মীয় বিশ্বাসকে অসম্মান করার জন্য নয়।’
বিশ্লেষকদের মতে, এমন ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। তাদের পর্যবেক্ষণ, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উগ্র ডানপন্থি গোষ্ঠী এবং কিছু মূলধারার রাজনৈতিক শক্তি দীর্ঘদিন ধরে ‘খ্রিস্টান ইউরোপ’ ও ‘বহিরাগত ইসলাম’—এই বিভাজনের ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে আসছে।
যদিও ইতিহাস বলছে, খ্রিস্টধর্ম ও ইসলাম—উভয় ধর্মেরই উৎপত্তি ইউরোপের বাইরে, একই ভৌগোলিক অঞ্চলে।
ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করে সমালোচনার মুখে পড়ার অভিজ্ঞতা শুধু ইয়ামালের নয়। ২০২৪ সালে জার্মানির ডিফেন্ডার আন্তোনিও রুডিগার রমজানের শুরুতে ইনস্টাগ্রামে এক আঙুল উঁচিয়ে একটি ছবি পোস্ট করেন, যা ইসলামে তাওহিদের প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
কিন্তু জার্মান সংবাদপত্র বিল্ড-এর সাবেক প্রধান সম্পাদক জুলিয়ান রাইশেল্ট ওই ছবিকে ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর প্রতি সমর্থনের প্রতীক বলে দাবি করেন।
পরে রুডিগার তার বিরুদ্ধে মানহানি ও বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগে আইনি পদক্ষেপ নিলেও মামলাটি শেষ পর্যন্ত আর এগোয়নি।
এদিকে, সৌদি আরবের বিপক্ষে ইয়ামালের সেজদার কয়েক দিন আগে তিউনিসিয়ার বিপক্ষে নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক গোলের পর একইভাবে সেজদা দেন সুইডেনের মিডফিল্ডার ইয়াসিন আইয়ারি।
তিউনিসীয় বংশোদ্ভূত এই ফুটবলার গোলের পর প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান জানিয়ে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতেও হাত তুলেছিলেন। তবে তার এই উদযাপন সুইডেনে জাতীয় পরিচয় ও নাগরিকত্ব নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।
সুইডিশ ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা জিম্মি আকেসনসহ অনেকেই আইয়ারিকে ‘প্রকৃত সুইডিশ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ নিয়ে নানা সমালোচনা দেখা যায়।
তবে এসব বিতর্কের জবাবে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন আইয়ারির বাবা আজুজ। তিউনিসিয়া থেকে সুইডেনে অভিবাসী হওয়া এই বাবা ছেলেকে শুরু থেকেই সুইডেনের হয়ে খেলার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন।
সুইডিশ সংবাদমাধ্যম আফটনব্লাডেট-কে তিনি বলেন, ‘আমার সন্তানরা সুইডেনের অংশ। তারা এখানেই জন্মেছে, এখানেই বড় হয়েছে, তাদের বন্ধুরাও এখানকার। আমি অভিবাসী হলেও ইয়াসিন তিউনিসীয় শিকড়ের একজন সুইডিশ নাগরিক।
তাই সুইডেনের হয়ে খেলার পূর্ণ অধিকার তার রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি সবসময় চেয়েছি সে সুইডেনের হয়েই খেলুক।
যে দেশ তাকে শিক্ষা, সুযোগ ও নিরাপত্তা দিয়েছে, সেই দেশের জন্য কিছু ফিরিয়ে দেওয়াটা তার দায়িত্ব বলেই আমি মনে করি। আজ তার অর্জনে আমি গর্বিত।’