আ জা ডেক্স
নানা ঘটনা, জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ এবং ধারাবাহিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেই শেষ হলো মো. সাহাবুদ্দিনের বঙ্গভবন অধ্যায়।
২০২৩ সালে দেশের ২২তম রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে শেষ দিন পর্যন্ত—তার মেয়াদকালের প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার অন্যতম প্রধান খোরাক।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বঙ্গভবনে:
২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ থেকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পান মো. সাহাবুদ্দিন।
শেষদিন পর্যন্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় নির্বাচন কমিশন তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করে।
তবে দলীয় কোনো শীর্ষনেতার পরিবর্তে সাবেক এক বিচারক ও আমলাকে রাষ্ট্রপতির আসনে বসানোয় খোদ আওয়ামী লীগের ভেতরেই ক্ষোভ দেখা যায়।
এর মধ্যে নিজের জন্মস্থান পাবনায় এক সংবর্ধনায় নিজেকে ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী হিসেবে দাবি করলে তার নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
শেখ হাসিনার পা ছুঁয়ে সালাম ও সোশ্যাল মিডিয়ার মন্তব্য:
দায়িত্ব গ্রহণের আগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পা ছুঁয়ে সালাম করার একটি পুরোনো ছবি নতুন করে ইন্টারনেটে ভাইরাল হলে সমালোচনা শুরু হয়।
বিরোধীদের মতে, দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদের নিরপেক্ষতার সঙ্গে এই দৃশ্য মানানসই ছিল না, যদিও আওয়ামী লীগ সমর্থকরা একে নিছক ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা হিসেবেই ব্যাখ্যা করেছিলেন।
এছাড়া, বঙ্গভবনে যাওয়ার আগেই সাংবাদিক নবনীতা চৌধুরীর একটি ছবিতে তার নামে থাকা একটি ফেসবুক আইডি থেকে ‘নাইস অ্যান্ড অ্যাট্রাকটিভ’ কমেন্ট করার স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ে।
আইডিটি আসল নাকি ভুয়া তা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও বিষয়টি নেটদুনিয়ায় বেশ হাসরসের জন্ম দেয়।
তিন সরকারের শপথ ও পদত্যাগপত্র বিতর্ক:
একই রাষ্ট্রপতির অধীনে তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরকার গঠিত হতে দেখা এক বিরল ঘটনা।
২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের পর শেখ হাসিনাকে শপথ করান তিনি।
এর কিছুদিন পর ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকেও শপথ পাঠ করান রাষ্ট্রপতি।
পরবর্তীতে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকেও তিনিই দায়িত্ব গ্রহণের শপথ করান।
ক্ষমতার এই পটপরিবর্তনের পরও তাকে পদে বহাল রাখা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল।
সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝড়ের সূচনা হয় ২০২৪ সালের অক্টোবরে। একটি সাক্ষাৎকারে সাহাবুদ্দিন মন্তব্য করেন, তার কাছে শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নেই এবং তিনি শুনেছেন, শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্র দেওয়ার সময় পাননি।
রাষ্ট্রপ্রধানের এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ রাজনৈতিক দলগুলো তার পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরাপত্তা জোরদার করে। সে সময় সংবিধান বিশেষজ্ঞরা জানান, রাজনৈতিক অসন্তোষ থাকলেও রাষ্ট্রপতিকে সরাতে হলে সংসদে অভিশংসন প্রক্রিয়ার প্রয়োজন।
পরিস্থিতি শান্ত করতে তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বিতর্ক দীর্ঘায়িত না করে রাষ্ট্র সংস্কার ও নির্বাচনে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান।
ফোনালাপের জের ও বিদায়:
অবশেষে লন্ডনে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় শেখ হাসিনার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির একটি ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে বিতর্ক নতুন মাত্রা পায়।
চরম রাজনৈতিক চাপের মুখে তিনি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন।
এক নজরে মো. সাহাবুদ্দিন:
১৯৪৯ সালে পাবনায় জন্মগ্রহণকারী মো. সাহাবুদ্দিন ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।
তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন।
পেশায় আইনজীবী সাহাবুদ্দিন বিচার বিভাগে যোগ দিয়ে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অবসর নেন।
পরবর্তীতে তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার সমন্বয়কারী এবং ২০০১ পরবর্তী রাজনৈতিক সহিংসতার তদন্ত কমিশনের প্রধান ছিলেন।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য থাকা অবস্থায় ২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন।